ঈদের ছুটির ১০ দিনে কেবল কক্সবাজারেই ভিড় করবেন ১০ লাখের বেশি পর্যটক। ওই পর্যটন নগরীর প্রায় ৯৯ শতাংশ এবং সিলেটের ৭০ শতাংশ হোটেল-রিসোর্ট আগেই বুকিং দেয়া হয়। একই সঙ্গে দেশের অন্য বিনোদন কেন্দ্রগুলোতেও ঈদের দ্বিতীয় দিন প্রচুর মানুষের সমাগম লক্ষ্য করা যায়। সব মিলিয়ে এবারের দীর্ঘ ছুটিতে পর্যটন খাতে ১ হাজার কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন।
সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা, পরিসংখ্যান ও প্রশিক্ষণ) জিয়াউল হক হাওলাদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গেল কয়েক বছরের তুলনায় এবার পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। এরই মধ্যে প্রায় সব হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট বুকিং হয়ে গেছে। কয়েক লাখ পর্যটক আসবেন এসব হোটেলে। আমরা সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। ধারণা করছি এখান থেকে ১ হাজার কোটি টাকা আয় হবে। যার মধ্যে হোটেল, রিসোর্ট, বিনোদন পার্ক, পরিবহনসহ অন্যান্য খাতের আয় জড়িত। পর্যটন খাতে আয় বাড়লে সরকারের রাজস্বও বাড়বে।’
সরকার এবার ঈদুল ফিতরের পর ঈদুল আজহায়ও দীর্ঘ ছুটি ঘোষণা করে। এ সুযোগে ভ্রমণপিপাসুরা পরিবার-পরিজন নিয়ে ভিড় করে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত; পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, সিলেটের সাদা পাথর, রাতারগুল, জাফলং; রাঙ্গামাটির কাপ্তাই লেক, ডিসি বাংলো, ঝুলন্ত সেতু, চাকমা রাজবাড়ী; বান্দরবানের নীলাচল, চিম্বুক পাহাড়, শৈলপ্রপাত ঝরনা; খাগড়াছড়ির আলুটিলা, দেবতা পুকুর, সাজেকসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে। আগে থেকে বুকিং ছাড়াও অনেকে ডে লং ট্যুরেও যান। এছাড়া রাজধানী ও বিভিন্ন জেলার পার্কগুলোয়ও ঘুরতে বের হন অনেকে। পর্যটন কেন্দ্রগুলোয় ২৪ ঘণ্টা মোবাইল সেবা দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসান।
ঢাকা থেকে কক্সবাজারে ঘুরতে আসা সায়েম আহমেদ বলেন, ‘ঈদের লম্বা ছুটি পেয়েছি এবার। পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে ঘুরতে এসেছি। ঈদের সাতদিন আগে হোটেল বুকিং করেছি। এবার দেখছি নিরাপত্তা বেশ ভালো, চারদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পর্যবেক্ষণ করছে, গভীর রাত পর্যন্ত টহল দিচ্ছে। এছাড়া ঈদের দিন সন্ধ্যায় আসার কারণে গাড়িতে ভিড় কম ছিল।’
এদিকে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন হোটেল ও রিসোর্ট মালিকরা। কক্সবাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ হোটেল বুকিং হয়ে যায় আগেই। এবার পর্যটকের চাপ বেশি থাকায় ছাড়ও দেয়া হচ্ছে কম।
হোটেল মালিকরা জানান, ঈদের মৌসুমে তাদের ব্যবসার পিক টাইম ধরা হয়। এবার সরকারি ছুটি বেশি হওয়ায় একটি লম্বা সময় ব্যবসা হবে। কেবল হোটেল মালিকই নন; এখানকার রেস্তোরাঁ, সি ফুড বিক্রেতাসহ বিভিন্ন পণ্যের বিক্রেতা ও পরিবহন চালকরাও এ মৌসুমের অপেক্ষায় থাকেন। এবার হোটেলে ভাড়া কিছুটা বাড়লেও মানুষের চাপ বেশি থাকায় অগ্রিম বুকিং হয়ে যাচ্ছে।
কক্সবাজারের হোটেল মালিক সমিতির নেতারা জানান, ঈদের কয়েকদিন আগে থেকে ছুটি শুরু হলেও গতকাল থেকে পর্যটকরা আসছেন বেশি। ১৩ জুন পর্যন্ত প্রায় সব হোটেলে আগাম বুকিং হয়ে গেছে। এবার প্রতিদিন গড়ে এক লাখের ওপর পর্যটক আসবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ১০ লাখের কাছাকাছি পর্যটক আসার সম্ভাবনা লম্বা এ ছুটিতে।
কক্সবাজারে পর্যটক বাড়লে দেশের অর্থনীতিতে তা ভূমিকা রাখে বলে জানান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এবার কক্সবাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ হোটেল আগেই বুকিং হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং সব সেবা দিতে জেলা প্রশাসন প্রস্তুত। এখানে পর্যটক বাড়লে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ বাড়বে।’
এদিকে সিলেটের প্রায় ৭০ শতাংশ হোটেল বুকিং হয়েছে। বিগত বছরগুলোয় এ সময় বন্যা ও পাহাড়ি ঢল হওয়ায় শুরুতে শঙ্কা তৈরি হলেও বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় পর্যটক আসতে শুরু করেছেন। সিলেট হোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউজ ওনার্স গ্রুপের সাবেক সভাপতি সুমাত নূরী চৌধুরী জুয়েল বলেন, ‘এক সময় পদ্মা সেতু উদ্বোধনের প্রভাব পড়েছিল সিলেটে। এবার মানুষ আবার সিলেটমুখী হয়েছে। এর সুফল পাবেন সিলেটের ব্যবসায়ীরা। এ ঈদের ছুটিতে বিভিন্ন হোটেলে ব্যাপক হারে বুকিং হয়েছে। অন্তত ৭০ শতাংশ হোটেল বুকিং হয়ে গেছে। অনেকে ছুটির শেষের দিকে বুক করছেন।’
এবার ঈদে শতকোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে বলে মনে করছেন সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) ফয়েজ হাসান ফেরদৌস। তিনি বলেন, ‘এবার প্রবাসীদের অনেকে দেশে ঈদ করছেন। তাই পর্যটন খাত থেকে এবার শতকোটি টাকা ব্যবসার আশা করা হচ্ছে।’
সিলেটের সব পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেয়া হয়েছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ বলেন, ‘ঈদের আগের সপ্তাহে কিছুটা শঙ্কা ছিল, তা কেটে গেছে। সবক’টা পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেয়া হয়েছে। এবার সবাই নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করতে পারবেন। পর্যটন স্পটগুলোয় সার্বিক নিরাপত্তা বিধানে এবং পর্যটকদের ভ্রমণ নির্বিঘ্ন করতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনও পদক্ষেপ নিয়েছে।’
ঈদে লম্বা ছুটি থাকলে রাঙ্গামাটি ও সাজেকের রিসোর্টগুলোয় প্রত্যাশা অনুযায়ী বুকিং হয়নি। সাজেকের ৯৮টি হোটেলের ৫০ শতাংশ বুকিং হয়েছে। এ বিষয়ে সাজেক রিসোর্ট ও কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জানান, ‘পর্যটকদের জন্য আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সাজেকে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৯৮টি রিসোর্ট-কটেজের ৫০-৬০ শতাংশ বুকিং হয়েছে এখন পর্যন্ত।’
ঈদসহ নানা উৎসব ঘিরে পর্যটকদের বুকিং বেড়ে যায় বলে জানান পর্যটন করপোরেশনের পরিচালক (বাণিজ্যিক) জামিল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘সে জন্য আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এ সময়ে যেহেতু বুকিং রেট বেড়ে যায় তাই ভালো সেবা দিতে আমাদের সব হোটেল-মোটেল প্রস্তুত। এবার পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে ফেসবুক, ইউটিউবে ভিডিও আপলোড করেছি। যেন পর্যটকরা আস্থা পান।’
এবার পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও অন্যান্য সেবা নিশ্চিতকরণকে জোর দেয়া হয়েছে। কেননা দেশের পর্যটন খাতকে উন্নত করতে পারলে দেশীয় পর্যটকের পাশাপাশি বিদেশী পর্যটক বাড়বে। আর পর্যটন কেন্দ্র থেকে আয় বাড়াতে পারলে দেশের রাজস্ব খাতে বিরাট ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফাতেমা রহিম ভীনা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের যাতে কোনো ধরনের দুর্ভোগে পড়তে না হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের যথাযথ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ট্যুরিজম বোর্ড ও পর্যটন করপোরেশনের সমন্বয়ে কাজ করছি। আমরা বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ভিজিট করছি। দেখছি পর্যটকরা সেবা পাচ্ছেন কিনা। পর্যটকরা কোনো সমস্যায় পড়লে সঙ্গে সঙ্গে যাতে সাহায্য পেতে পারেন সেজন্য রয়েছে হ্যালো ট্যুরিস্ট নামে হটলাইন নম্বর। যেকোনো মুহূর্তে ওই নম্বরে যোগাযোগ করে সেবা নেয়া যাবে।’
(প্রতিবেদন তৈরিতে সিলেট, রাঙ্গামাটি, পটুয়াখালী প্রতিনিধি সহযোগিতা করেছেন)